হাওজা নিউজ এজেন্সি: বুধবার রাতে এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে ইরানের শীর্ষ কূটনীতিক স্পষ্ট জানান, ইরানের বর্তমান নীতি হলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের উসকানিমূলক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ অব্যাহত রাখা।
হরমুজ প্রণালীতে ইরানের অবস্থান
হরমুজ প্রণালী প্রসঙ্গে আরাকচি বলেন, শত্রু ও তাদের মিত্র দেশগুলোর সব জাহাজের জন্য এই প্রণালী বন্ধ রাখা হয়েছে, তবে বন্ধুত্বপূর্ণ দেশগুলোর জন্য তা উন্মুক্ত।
কিছু দেশের অনুরোধের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “অনেক জাহাজের মালিক বা যে দেশগুলোর পতাকাবাহী সেই জাহাজগুলো আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে নিরাপদ চলাচলের অনুরোধ জানিয়েছে। আমরা চীন, রাশিয়া, পাকিস্তান, ইরাক ও ভারতের মতো আমাদের বন্ধু দেশগুলোর কিছু জাহাজের জন্য নিরাপদ চলাচলের ব্যবস্থা করেছি।”
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা নয়
সাক্ষাৎকারের অন্যত্র পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনা চলছে না। অঞ্চলের অনেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও ইরানের অবস্থান ‘নীতিগত ও দৃঢ়’ রয়েছে।
আরাকচি বলেন, কিছু তৃতীয় দেশ এই আগ্রাসন বন্ধে মধ্যস্থতার চেষ্টা করলেও “আন্তর্জাতিক নিশ্চয়তা শতভাগ নির্ভরযোগ্য নয়।”
“আমরা যে আত্মনির্ভরশীল নিশ্চয়তা নিজেরাই তৈরি করেছি, তার ফলে কেউ আর ইরানি জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ঝুঁকবে না,” বলেন এই মন্ত্রী। তিনি ইরানের সামরিক বাহিনীর পাল্টা অভিযানের দিকে ইঙ্গিত করেন, যেখানে দেশটির সশস্ত্র বাহিনী সারা অঞ্চলে মার্কিন ও ইসরায়েলি সংবেদনশীল ও কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে অন্তত ৮১ দফা নিরবিচ্ছিন্ন পাল্টা হামলা চালিয়েছে।
আঞ্চলিক দেশগুলোর প্রতি বার্তা
আরাকচি বলেন, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো প্রমাণ করেছে, যুক্তরাষ্ট্রকে আঞ্চলিক দেশগুলোর অভ্যন্তরে ঘাঁটি স্থাপনের অনুমতি দেওয়া আয়োজক দেশগুলোর নিরাপত্তায় অবদান না রেখে বরং তাদের জন্যই হুমকিতে পরিণত হয়।
“এই যুদ্ধ অনেক সত্য উন্মোচন করেছে, যার মধ্যে একটি হলো—মার্কিন ঘাঁটিগুলো শুধু আয়োজক দেশগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থই হয়নি, বরং তাদের জন্য অস্থিতিশীলতার উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে,” বলেন তিনি।
আরাকচি কাতার, বাহরাইন, কুয়েত ও জর্ডানের মতো আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর ভূখণ্ডে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলো ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর পাল্টা হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে বলে উল্লেখ করেন। “এই দেশগুলোতে যদি হামলা হয়, তা ওই ঘাঁটিগুলোর উপস্থিতির কারণেই,” বলেন তিনি।
“অঞ্চলের দেশগুলোর প্রতি আমার বার্তা হলো—ইরানের ভূখণ্ড ও জনগণের বিরুদ্ধে এই মার্কিন-ইসরায়েলি আগ্রাসন থেকে তাদের অবশ্যই নিজেদের দূরত্ব বজায় রাখতে হবে এবং এই যুদ্ধ থেকে নিজেদের আলাদা করতে হবে।”
পররাষ্ট্রমন্ত্রী কিছু আঞ্চলিক দেশের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তারা আগে জানিয়েছিল ইরানের বিরুদ্ধে নিজেদের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দেবে না, কিন্তু পরে নিজেদের কথা থেকে সরে গেছে। “আমরা বিশ্বাস করতে পারি না যে এটা তাদের অজান্তেই ঘটেছে,” বলেন তিনি।
পাল্টা হামলায় সাফল্য ও আলোচনার প্রস্তাব
আরাকচি আগ্রাসনের ধারা এবং ইরানের দৃঢ় পাল্টা অভিযানের বিষয়েও কথা বলেন। ইরানের সশস্ত্র বাহিনী শত শত ব্যালিস্টিক ও হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন শত্রু লক্ষ্যবস্তুতে নিক্ষেপ করেছে।
শত্রুপক্ষের কয়েকটি উদ্দেশ্য—যেমন দেশকে বিভক্ত করা, দ্রুত বিজয় অর্জন এবং অভ্যন্তরীণ ঐক্য নষ্ট করা—ব্যর্থ হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
ইরানের এই পাল্টা অভিযান দেশটির ইতিহাসে ‘একটি স্বর্ণালি অধ্যায়’ বলে বর্ণনা করে আরাকচি বলেন, ইরান দুইটি পরমাণুশক্তিধর আগ্রাসনকারী রাষ্ট্রকে তাদের লক্ষ্য অর্জনে বাধা দিয়েছে।
পাল্টা হামলার এই সাফল্যের চূড়ান্ত প্রমাণ, বলেন তিনি, এই যে আগ্রাসনকারীরা এখন ইরানের সঙ্গে আলোচনার কথা বলছে, অথচ শুরুর দিকে তারা তেহরানকে ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের’ আহ্বান জানিয়েছিল।
“আলোচনার কথা বলাটাই এখন তাদের পরাজয় মেনে নেওয়ার শামিল। তারাই কি ছিল না যারা ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের’ কথা বলেছিল? তাহলে এখন কেন তারা তাদের সর্বোচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের আলোচনার পেছনে লেলিয়ে দিচ্ছে?”—প্রশ্ন করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
আপনার কমেন্ট